আমার বাগানবেলার কথা লিখেছিলাম...
মার হাত ধরে এক নতুন শহরে ঢুকছিলাম। মিটারগেজ ট্রেনটা অন্যদিনের তুলনায় বেশ ধীরেই স্টেশনে প্রবেশ করছিল। তখন স্টেশনে এক অদ্ভুত হলুদ রঙের লাইট থাকত। কেমন যেন ভূতুড়ে। যদিও রেলের সবই আমার আজও ভুতুড়েই মনে হয়। খুব সম্ভব দেওয়াদা সাথে ছিল, তাই ততটা কষ্ট হয়নি ঘরে পৌঁছাতে। আমাদের প্রথম আস্তানা হয়েছিল নুতনপট্টি, তুষার কাকুর ঘরে। অবশ্যই ভাড়াটিয়া হিসেবে। বাগানের নির্মল পরিবেশ ছেড়ে, মাটির ঘর ছেড়ে সোজা দালান বাড়ী। সত্যি বলব মন্দ লাগছিল না। মায়ের সংসার সাজানো দেখছিলাম। কিভাবে স্বল্প জিনিষ দিয়ে সুন্দর করে ঘর সাজানো যায় তা বোধহয় মার থেকে ভালো কেউ জানত না। স্টিলের থালাকে উল্টো করে অরেঞ্জ কোয়াশের বোতল দিয়ে যে কেউ রুটি বানাতে পারে তা নিজে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল হত।
আগেই বলেছিলাম বাবু আসাম থাকতেন। তাই বেতনের অপেক্ষা করতে হত। তখন বাবু আর মার একটা জয়েন্ট একাউন্ট ছিল ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক এ। ওখানে পাসবুক দেখিয়ে জানতে হত যে টাকা এসেছে কি না। যেদিন টাকা ঢুকত খুব আনন্দ হত। মার সাথে যেতাম কুসুমালয়ে। সেই দোকানের গন্ধ আজও মনে আছে। তখন বন্ধু বলতে কেউ ছিল না।
যাইহোক একদিন স্কুলে ভর্তি হলাম। ধর্মনগর জুনিয়র বেসিক স্কুল। অনেকখানি আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা, লজ্জা নিয়ে ক্লাস থ্রি তে বসলাম। বাপ্পা সেন আর সুদীপ্ত দাস আমার প্রথম বন্ধু। আজও সেই দিন খুব স্পষ্ট মনে আছে। ধীরে ধীরে আরো বন্ধু হল। বেশ নাম ও হল স্কুলে। না না পড়াশুনার জন্য নয়। জানতে পারলাম যে রিনি পাল ফার্স্ট গার্ল। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে মেয়ের অভাব ছিল না। পৃথ্বীরাজ ও আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেল। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি রিনি ও পৃথ্বীরাজ যথাক্রমে গীতা দিদিমণি ও শিউলি দিদিমনির মেয়ে ও ছেলে। রিনির সাথে আমার কথাবার্তা প্রায় হতই না। আমি অন্তত মনে করতে পারছি না। কারন কিন্তু কিছুই নয়। যদিও রিনির সাথে এখন ফেবুতে কথাবার্তা হয়। একটা কথা অকপটে স্বীকার করব। বন্ধু অনেক ই হয় বা সবাই হয় কিন্তু মনের বা আত্মার সাথে মিল খুব কমই হয়। এই কানেক্ট হয়েছিল সুদীপ্ত আর বাপ্পার সাথে আর পরে পৃথ্বীরাজ এর সাথে। আর মেয়ে বন্ধুদের মধ্যে চৈতালি, মৌটুসী আর সুকৃতি আচার্য্য। বাকিদের খুঁজে পেলেও সুকৃতিকে আর কখনও পাই নি। যাইহোক হই হই করে পড়াশুনা, খেলাধুলা চলতে থাকল। তখন বিবিআই স্কুল মাঠে পদ্মজং মেমোরিয়াল শিল্ড ফুটবল টুর্ণানেন্ট হত। আসাম, মনিপুর, মিজোরাম এমনকি বাংলাদেশ থেকেও টিম আসত। কিছু না বুঝলেও মাঠে যেতাম খেলা দেখতে। সেসময় পুরো শহরে একটা উৎসব এর সূচনা হত। রিক্সায় মাইক লাগিয়ে কোন দলের খেলা তা ঘোষণা করা হত। অবাক চোখে দেখতাম, রিক্সার পেছনে ছুটতাম। সত্যি কি অফুরন্ত আনন্দ।
তারপর একটা অজানা কারণে আমরা নুতনপট্টি থেকে হাসপাতাল রোডে শিফট হয়ে যাই। ততদিনে বাগানকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। নুতন শহর, নুতন বন্ধু, নুতন পরিবেশ। যদিও আমার জন্য নুতন ছিল না। বাবুর চাকরির দৌলতে এই ছোট্ট বয়সেই আমার প্রায় আসাম ভ্রমন শেষ ছিল।
দেখতে দেখতে পূজা এসে গেল। এই আমার প্রথম শহরের পূজা দেখা। এত চমক, সাজ সজ্জা, আলো। চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মায়ের হাত ধরে এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল। বাবু পূজার ছুটিতে আসতেন। আমার নুতন জামা কাপড় হত, মার শাড়ি, কিন্ত একটা অজানা কারণে বাবুর সেই পুরনো শার্ট। কারনটা আজ বুঝি।
ফিরে আসি স্কুলে। তখন ঠিক স্কুলের সামনেই ছিল বিশালাকায় কিছু গাছ। পরবর্তী সময়ে নগরোণ্নয়নের নামে ওদের বলি দেওয়া হয়। ওই গাছের নিচেই সুবীর কাকুর আচার, লজেন্স এর দোকান। কখনও 50 পয়সা বা 1 টাকা হাত খরচ পেতাম। আচার, লজেন্স বা রঙ বেরঙের আইসক্রিম খেয়ে খেয়ে বাড়ী ফিরতাম। এই আইসক্রিম কিন্তু আজকের আইসক্রিম নয়। এটাকে বোধহয় বরফ বলাই ঠিক হবে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি সেই স্বাদ বা আনন্দ আজকের আইসক্রিমে নেই। নুতন ক্লাসের বই কেনা বা স্কুল পোষাক কেনাও ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। বইয়ের জন্য যেতাম উমা বুক স্টল বা রয়েল লাইব্রেরী। অভাবের সংসার হলেও মা বাবু বই কিন্তু নুতন কিনে দিতেন। পুরোন বই ও পাওয়া যেত। সে কি উত্তেজনা বই কিনতে গিয়ে। 3-4 দিন তো বলতে গেলে ঘুম আসত না চোখে। আর বইয়ের সাথে কলম, কাঠ পেন্সিল, ইরেজার বা রাবার, পেন্সিল কাটার ইত্যাদি ও থাকত। বইয়ের গন্ধ, রঙ, আকার, মলাট লাগানো আর সাথে তড়িৎ গতিতে পড়ে ফেলা। স্কুলে বই নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার থাকত এলুমিনিয়ামের বাক্স আর আমার ছিল একটা প্লাস্টিকের বাক্স। যেটা আমাকে সবার থেকে একটু আলাদা করত। পোষাকের জন্য গোপীনাথ স্টোরস। জানিনা আজ দোকানটা আছে কি না। খয়েরি হাফ প্যান্ট আর সাদা শার্ট।
আমরা স্কুলে নানা রকম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। ট্যাবলু তার মধ্যে অন্যতম। আমরা সাজতাম নানা সাজে, কেউ গুজরাটি, কেউ মারাঠি, কেউ মুসলমান। উচ্চতার জন্য আমি পাঞ্জাবী সাজতাম। তারপর স্যার আর দিদিমণিদের তত্ত্বাবধানে পথ পরিক্রমা। গান,আবৃত্তি সবেতেই অংশগ্রহণ করতাম কিন্তু নিজের প্রতিভা বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। একবার একটা নাটক করে অবশ্য কিছু প্রশংসা কুড়িয়েছিলাম। একলব্যের বন্ধু বসন্তের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমার মনে আছে এক সাঁওতাল ছেলের ভূমিকা ছিল কিন্তু মেকআপ ম্যান ভুলবশত আমাকে রাজপুত্রের মত সাজিয়েছিল। অবশেষে ওই সাজেই অভিনয় করেছিলাম।
মা বাবু হঠাৎ করেই একদিন আমাকে পদ্মপুর নিয়ে গেলেন। বাবুর মামার বাড়ী সেখানেই ছিল। ওখানে গিয়ে প্রথম জানলাম যে আমাদের নিজস্ব ঘর ওখানেই হচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে কুটির, "গুরু দয়াল কুটির"। আমার বাবু দাদুর নামে নামকরণ করেছিলেন। আমার নুতন ঠিকানা। প্রেমানন্দ কাকুর ধানের জমি ছিল। ওখানেই পুকুর খুদাই করে ভিটে তৈরী হল। বাঁশের বেড়া, ছনের ছাউনি। সে এক স্বপ্নের ভুবন। পাশেই মৃতপ্রায় জুরি নদী। বাঁশ ঝাড়ের নীচে কাঁচা শৌচালয়। আর সদ্য বর্ষায় স্ফীত পুকুর। একদিন মাছের পোনা ফেলা হল। মা খুব ভালো বাগান করতে পারতেন। খুব তাড়াতাড়ি গুরু দয়াল কুটির আশ্রমের মত হয়ে গেল। উর্বর জমিতে ফুল ও সব্জির চাষ ভালোই হত। কতরকম ফুল ফোঁটাতেন মা। চন্দ্র মল্লিকা, পদ্ম, 9 ও ক্লক, সন্ধ্যামালতি, গাঁদা। ফুলের গাছ লাগানো থেকে শুরু করে কলি ধরা ফুল ফোটা অব্দি আমি সাক্ষী থাকতাম।
বর্ষাকাল আর বৃষ্টি আমার চিরপ্রিয়। তুফানের সময় কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বাতাসের তান্ডবে বাঁশগাছগুলো কেমন মাটি ছুঁই ছুঁই করত। গোস্বামী কাকুর বাড়ির পেছনে একটা শিমুল তুলার গাছ ছিল। কালো আকাশে শ্বেত শুভ তুলার উড়ে আসা দেখতাম হা করে। তারপর চলত বৃষ্টির তান্ডব। আর আমি মায়ের সাথে গুটি গুটি বিছানায় শুয়ে বৃষ্টির শব্দ উপভোগ করতাম। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে পৃথিবীকে সিক্ত হতে দেখতাম। নিজে শুকনো থেকে বৃষ্টি দেখাও কিন্তু খুব রোমাঞ্চকর। বৃষ্টি শেষ হলে আবার গাছ দেখতে বেরোতাম। তখন যেন সব গাছ গাছালিকে খুব খুশী লাগত। একদিন এইরকম বৃষ্টি শেষে মার সব্জী খেত দেখছি। হঠাৎ দেখি শসা আর কাকরুল গাছে দু দুটো মধ্যম আকারের নব্য সব্জী। হয়তো কোন পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। এই আনন্দ অনেকটা গুপ্তধন পাওয়ার মতোই। খুব কাছে গিয়ে শসাটাকে দেখলাম। অনেকটা ছোট্ট হাঁসের ছানার মতোই। খুব কম সব্জী ই আমরা বাজার থেকে কিনে আনতাম। তবে চালের জন্য যেতাম। 2 টাকা 25 পয়সার চাল কিনেছিলাম প্রতি কেজি।
মা হাঁসের ছানা কিনেছিলেন। চার টা মেয়ে হাঁস আর একটা ছেলে। এবার আমার পুরো মন ওদের দিকে। ওদের ঘর খুলে বের করা, পুকুরে পাঠানো,খাওয়া দেওয়া আবার পুকুর থেকে ঘরে উঠানো। ততদিনে পুকুরে কচুরিপানা হয়ে গেছে। হাসগুলো ও বড় হচ্ছিল। একদিন ঘর খুলে হাঁস বের করতে গিয়ে দেখি চার চারটা ডিম। আমার আজও ডিম দেখলে ওই দিনের কথা মনে পড়ে। উত্তেজনায় এত জোরে চিৎকার করেছিলাম যে আশেপাশের লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাঁশঝাড়ের পাশেই একটি কলাবাগান ছিল। পরে আরেকদিন ঐ কলাবাগানে প্রায় 12টি ডিম পেয়েছিলাম। সেও গুপ্তধন প্রাপ্তির সমান।
দেখতে দেখতে আমিও বড় হতে থাকি। মর্নিং স্কুল ছিল। আমি পৃথ্বীরাজ, সুদীপ্ত আর রাজুর সাথে বড় হতে থাকি। পৃথ্বীরাজ আমাকে সাইকেল চালানো শেখায়। আমাদের আরেকটা নিয়ম ছিল বন্ধুদের বাড়ীতে থাকা। যেটা আজকাল আর দেখি না। এটা বেশ পালা করেই চলত। আমি ঘুম থেকে উঠে নিজেই টিফিন বানিয়ে পদ্মপুর থেকে হেঁটে স্কুলে যেতাম।
বাবু পুনরায় আসাম চলে গেলেন। ততদিনে আমি বাজার করা, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, রেশন তোলা সব শিখে গেছি।
আমি টুক টুক করে সারা বছর পড়তাম। সন্ধ্যা হলে হ্যারিকেন জ্বেলে মাটিতে চালের বস্তায় বসে বই পড়তাম। মা রান্না করতেন। সেই শব্দ আর গন্ধ খুব মিস করি। এই বাড়িতেই একদিন বিদ্যুৎ সংযোগ হল। প্রায় দুদিন 40 পাওয়ারের বাল্ব দেখেই কাটিয়ে দিই। আমার মনে হয়েছিল দুর্গাপূজা বোধহয় আমার বাড়িতেই হবে।
(চলবে)
Wednesday, 31 October 2018
ছেলেবেলা
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment