Monday, 1 October 2018

আমার বাগানবেলা


তিলভুম, টিরিমটি ও মেদলি এই তিনটি নাম আপনাদের কাছে অপরিচিত হলেও আমার স্মৃতির অনেকটা জড়িয়ে আছে এই ত্রিনাম। এই তিনটিই হলো অধুনা করিমগঞ্জের অন্তর্গত অতি মনোরম চা বাগান। তারমধ্যে টিরিমটি আমার জন্মস্থান। এই জায়গাতিনটে আলাদা হলেও মোটামুটি পাশাপাশিই বলা যায়।  যারা আসাম থেকে ত্রিপুরা ট্রেনে যাতায়াত করেন তারা নিশ্চয়ই তিলভুম রেল স্টেশন দেখেছেন।
আমার বাবা আসাম বনবিভাগে চাকুরী করতেন বাবার ঘন ঘন স্থান বদল হতো যার  জন্য আমি আমার জেঠু ও বড়মার সাথে এই বাগানেই থাকতাম। আমার জেঠু এই তিলভুম চা বাগানে কর্মরত ছিলেন। আমাদের একটা মস্ত কোয়ার্টার ছিল। মাটির ঘর, বড় বড় রুম। একটা ছোট টিলার উপর ছিল এই কোয়ার্টার। একটা কুয়ো ছিল। সেই শীতল ও পরিষ্কার জল এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়না। আজো বোধহয় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই তো ১৯৮৪-৮৫ সালে তো প্রশ্নই উঠে না।
আমার জেঠু খুবই রাশভারী লোক ছিলেন। আর সবাই উনাকে কেরানিবাবু বলেই ডাকতো। সারাজীবন উনাকে ধুতি ও পাঞ্জাবীতে দেখলাম। উনার একটা নিজস্ব বেডরুম কাম অফিস ছিল। একটা ঢাউস খাতা প্রতিদিন কেউ না কেউ বয়ে নিয়ে আসত। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতেন উনি। সবাই উনাকে বাঘের মত ভয় পেত। আমার বাবাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু আমার সব আবদার ছিল উনার কাছেইপ্রায়ই উনার সাথে ঘুমাতাম। পরীক্ষার ফল খারাপ হলেও উনার টেবিলে মার্কশিট চাপা দিয়ে রাখতাম। কিন্তু জেঠু ছিলেন নারকেলের মতো। বাইরে শক্ত ভিতরে নরম। যত বড় হয়েছি ততই বুঝতে পেরেছি।
আমাদের মস্ত খেত ছিল। ওই টিলাতেই বাগানের শ্রমিকরা জমি তৈরি করে দিত। এমন কোন সবজী ছিল না যে আমাদের খেতে হত না। জমি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত আমি ওদের সাথে থাকতাম। ওদের নাম ছিল বুধুয়াদা, লক্ষ্মীন্দরদা, দেওয়াদা, লক্ষ্মীদি। লক্ষ্মীদি আমার মায়ের মতই ছিলেন। দেওয়াদা আর লক্ষ্মীদি স্বামী স্ত্রী। ওদের ছেলে মেয়েরা আমার বন্ধু। সবাই মিলে খুব ফুর্তি করে ফসল কাটতাম। আমার চোখ থাকত আলু খেতে। মাটি খুঁড়ে আলু বের করাটা আমার কাছে গুপ্তধন পাওয়ার মত মনে হত। এই বাগানবাড়ীতে কি ছিল না। আম, কাঁঠাল, গোলাপজাম, ভুবি, পেয়ারা, লিচু। জেঠু ও বড়মা দুজনেই স্বরুপানন্দের   (বাবামনির) দীক্ষিত ছিলেন। প্রায়ই আমাদের ঘরে উপাসনা হত। সে কি আনন্দ বলে বোঝান যাবে না। বিশাল ফুল বাগান থেকে ফুল তুলতাম। পুরো ঘর পরিষ্কার করা হত। আমি একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে উৎসব থেকে উৎসবের প্রস্তুতি অনেক বেশি আনন্দদায়ক। বাগানবাড়ীর পিছন দিকটা ঢালু ছিল। ওখানটাতেই ছিল মস্ত গোয়ালঘর। মোট ১৪ টি গরু ছিল আমাদের। আমার প্রিয় গরুর নাম ছিল টিকলি গাই। সবকটার নাম ছিল। কিন্তু টিকলি আর কাল গাই এর নাম মনে আছে। আর ছিল অনেকগুলো ছাগল আর লালি। একটা বুড়ো ছাগল ও  ছিল। আমি ওই ছাগলের দুধ খেয়ে নাকি বড় হয়েছি। মায়ের কাছে শোনা। যখনই সুযোগ পেত আমাকে আদর করে যেত ওই ছাগলটা।  আর লালি আমার আদরের কুকুর। লালি আমার জীবনে কি ছিল সেটা একটা লাইন দিয়ে বলব। আমি লালিকে প্রনাম না করে পরীক্ষা দিতে যেতাম না। আমাদের একটা ময়না পাখীও ছিল। যদিও ওর কথা বেশী মনে নেই। প্রকৃতির সাথে থাকলে কোন এলার্ম এর প্রয়োজন হয়না। ভোর হলেই অসংখ্য পাখীর কোলাহলে ঘুম ভেঙ্গে যেত। শালিক, চড়ুই ওরা যে কি কোলাহল করতে পারে তা বোধহয় নতুন প্রজন্ম কোনদিন জানতেও পারবে না। খুব বিরক্ত লাগত আর আজ ওদের খুঁজেও পাই না। আরেকটা অদ্ভুত প্রানি ছিল, আমরা কক্ক বলেই চিনতাম। ত্রিসন্ধ্যার সময় যেন ঠাকুর ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর কথা মনে করিয়ে দিত ওদের ডাকআর ওদের ডাক কোনদিন শুনলাম না। ওই গোলাপজামের মতোই হারিয়ে গেল।   
তো এইভাবে গাছ, ফুল, ফল, সবজী খেত, গরু, পাখী ও প্রকৃতি নিয়েই চলছিল আমার জীবন। ধীরে ধীরে আমার গণ্ডি কোয়ার্টার থেকে বাইরে বেরোতে শুরু করল। আমি স্কুলে গেলাম। কোনাগাও নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়। একটা বটগাছের নীচে কুঁড়ে ঘর। কাঁঠাল গাছের তক্তা দিয়ে তৈরি বেঞ্চ। চারদিকে জঙ্গল আর ঠিক মাঝখানে আমার স্কুল। আমার প্রথম শিক্ষক চূড়ামণি স্যার। আজ জানিনা কোথায় আছেন। আমার প্রথম বান্ধবী শিল্পী নাথ। শিল্পীর সাথে পরে দেখা করেছিলাম কিন্তু স্যার তখন করিমগঞ্জে ছিলেন শিল্পীর এখন ৩ ছেলে। ঘোর সংসারী যাকে বলে।  পড়া শেষ করেই ছুট মাঠে, জঙ্গলে। তখন আমরা স্লেট ব্যবহার করতাম। আর একটা জংলী ফল দিয়ে স্লেট পরিষ্কার করতাম।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রেল লাইন ক্রস করতে হত। আমি আর শিল্পী রেল লাইনে কান পেতে শুনতাম রেল আসছে কি না। রেল লাইনের পাশেই ছিল শিল্পীর বাড়ি। ও ঠিক বুঝে যেত। একটা রেল গেইট ছিল আর গেটম্যান কাকু জেঠুর বন্ধু। একদিন আমি আর শিল্পী রেল লাইন থেকে  পাথর কুড়িয়ে ট্র্যাক এর উপর সাজিয়ে রেখেছিলাম। আর দূর থেকে দাড়িয়ে দেখছিলাম যে কিভাবে ওই পাথরগুলো গুড়ো হয়ে যায়। আমি আর শিল্পী ছাড়াও গেটম্যান কাকু এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। পরে যথারীতি উত্তম মধ্যম খাই  জেঠুর হাতে। ওইদিন রেল ড্রাইভার ও  বকা দিয়েছিলেন চলন্ত ট্রেন থেকে। পরে বুঝতে পারি কি বিপদজনক ছিল এই খেলা। ট্রেন দেখার কি উত্তেজনা সে বলে বোঝান যায় না।
বুধবার ছিল হাটবার। যেদিন জেঠুর হাতে উত্তম মধ্যম খেতাম সেদিন থেকে আমি বুধবারের অপেক্ষা করতাম। হাটে দানাদার নামের একটা মিষ্টি পাওয়া যেত। আর স্বান্তনা পুরস্কারের নামে ওইটা ছিল আমার পাওনা। হাটটাও একটা প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগানের। মস্ত বড় একটা খালি মাঠের একপাশে নদী, পাশেই মেঠো রাস্তা আর তারপরেই ধান খেত। ধান খেতের পরেই রেল লাইন। আর নদীর অপারেই ছোট্ট পাহাড় আর তার উপর শিব মন্দির। একটা বাঁশের সাঁকো দিয়ে ওই ওপারে গিয়ে শিব মন্দিরে যাওয়া যায়। ওই একদিন ই পারমিশান মিলত মন্দির যাওয়ার। আমি আর শিল্পী উপরে উঠে হাট আর রেল লাইন দেখতাম। হাটে কি ছিল না। হাস, মুরগি, গরু, ছাগল থেকে শুরু করে, হরেক মাল, দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিষ, কাপড় চোপড়, বিস্কুট, সবজী, মাছ সব। বিকেল ৩ টা থেকে ৬ টা অব্দি সে কি অনাবিল আনন্দ।  নরোত্তম কাকু যদিও একটু আপ্রাসঙ্গিক কিন্তু উনি আমাদের মুখি যোগান দিতেন। উনার খেতের মুখি মানে মাখনের মত নরম। জেঠুর খুব প্রিয় ছিল। আর রহিম কাকু পাথারকান্দি থেকে মাছের যোগান দিতেন।  সব থেকে ভালো মাছ টা আমাদের বাড়িতে আসবেই।
তিলভুমের গল্পতে যদি চাবাগানের বর্ণনা না দেই তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চুরাইবাড়ি পেরিয়েই বাদিকের রাস্তাটাই তিলভুমের রাস্তা। পুরোদস্তুর মাটির রাস্তা। আর দুপাশে চা বাগান। বাগান তো নয় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো। চা গাছকে ছায়া দেয়ার জন্য বড় বড় কৃষ্ণচুড়া, শিরিশ গাছের মেলা। লাল সবুজের স্বর্গ। মহিলা চা শ্রমিকরা গান গেয়ে কচি পাতা তুলে নেয় নিজের ঝুড়িতে। রাস্তার দুপাশেই বাগান। কিছুদুর এগোলেই একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদী। বাগানের সাহেব আর ট্র্যাক্টর এর জন্য একটা কাঠের ব্রিজ বানানো আছে। আমার টিকলি গাই এই ব্রিজে চাপত না। বোধহয় কোন অজানা ভয় ছিল।
এই নদীতে বর্ষাকালে বাঁশের চাটটা চলত আর কলাগাছের ভুর। বাড়িতে না জানিয়ে অনেক চড়েছি বুধুয়াদার দৌলতে। এই চা বাগানে ঘুরতে ঘুরতে কত পাখীর বাসা ও  বাচ্চা দেখলাম। গাছের কোটরে হাত ঢুকিয়ে কত পাখীর বাচ্চা বের করলাম তার ইয়ত্তা নেই। বন্যাকে বাগানের শ্রমিকরা গোল্লা বলত। তখন ঘর থেকে বেরোনো নিষেধ। আর আমি উঠোনে ছোট্ট বাধ বানিয়ে কৃত্রিম  গোল্লা বানাতাম।
বাগানের আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লেবার লাইন। মানে চা শ্রমিকদের বাসস্থান। আমাকে খুব আকর্ষিত করত। ছোট ছোট দোকান থাকত। ওরা খুব কম পরিমাণে জিনিষ কিনত। ছোট্ট বোতলে তেল, অল্প ডাল এইরকম। বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে আটা, কেরোসিন দেওয়া হতো। আর মাঝে মাঝে সিনেমাও দেখান হত। আমার প্রথম সিনেমা প্রেম প্রতিজ্ঞা। অনেকটা স্বদেশ সিনেমার মতোই। মা, বড়মা, বৌদি র সাথে হা করে দেখেছিলাম। জেনারেটর দিয়ে চালানো হত এই সিনেমা।
বাগানেও দুর্গা পুজো হতো। কাপড়ের দোকান বসত। সবাই এই সব দোকান থেকেই কাপড় কিনত। কিন্তু আমরা ট্রেনে চেপে করিমগঞ্জ যেতামট্রেনে আবার জানালার পাশে বসার উপায় নেই। কয়লার ইঞ্জিন থেকে নাকি চোখে কয়লা ঢুকে যায়। Aryabas হোটেল এ থেকে আমাদের কাপড় কেনা হতো। করিমগঞ্জ আমার জীবনের প্রথম শহর। খুব খুশি হতাম ওখানে গিয়েমনে হত যদি ওখানে থাকতে পারতাম। রাতেই ফিরে আসতাম। ততক্ষণে রাত হয়ে যেত। স্টেশন থেকে বাড়ি পৌঁছেই আবার ঘুম। ছিল না কোন চাপ, কোন দ্বায়িত্ব।
বাগানে নামঘরে পুজো হত। মূর্তি বানানো শুরু থেকে শেষ অব্দি বসে থাকতাম। একদিন পুজোর দিন এসে যেতউপচে পড়া খুশি আর প্রাণখোলা আনন্দে পুজো কাটাতাম। কত বেলুন, বন্দুক, লারে লাপ্পা, আর প্লাস্টিকের খেলনা। কত অল্পতে খুশি হতে পারতাম।
এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা বাগান ছেড়ে ধর্মনগর যাই একদিন। বাগান থেকে হেটে হেটে স্টেশন এ যেতে যেতেও ভাবিনি যে এটাই শেষ দেখা বাগানকে। 
নাড়ির টানই হোক বা ছোটবেলার স্মৃতিই হোক খুবই মধুর এই স্মৃতি রোমন্থন। (চলবে) 
-তপোময় চক্রবর্তী, হায়দ্রাবাদ

No comments:

Post a Comment