Thursday, 20 September 2018

টাকা

টাকা পয়সা নাই বা থাকলো, নাই বা থাকল গাড়ি, বাড়ি ঘর,
না থাকুক ফ্ল্যাট, মোটা মাইনে, নাই বা থাকল চাকর বাকর।
হলিডে নাই বা থাকল, নাই বা গেলাম ঘুরতে এথেন্স,
না থাকুক দামী আসবাব, নাই বা থাকল মোটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স।
নাই বা খেলাম পাঁচতারা  হোটেল এ, নাই বা গেলাম শপিং মলে,
নাই বা গেলাম দামী আউটলেটে, নাই বা গেলাম শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হলে।
আমি পাহাড়, নদী দেখতে চাই, দেখতে চাই মাঠ, 
কুঁড়ে ঘরে থাকতে চাই, আর দেখতে চাই হাট ।
হাসতে চাই, বাঁচতে চাই, উড়তে চাই আকাশে,
আমি খুশি খুঁজে পাই, জঙ্গলে আর ঘাসে।

-তপোময় চক্রবর্ত্তী, হায়দ্রাবাদ

Sunday, 16 September 2018

গন্ধ

অনেকদিন থেকে ভাবছি গন্ধ নিয়ে কিছু একটা লেখি...
আমাদের ঘ্রানেন্দ্রিয় আর স্মৃতির একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। আমি বন্যার জলের গন্ধ, কুয়াশার গন্ধ, কাপড়ের গন্ধ, বৃষ্টির গন্ধকে আলাদা আলাদা করে চিনতে পারি। হায়দ্রাবাদ আর চেন্নাই এর চা এর গন্ধ ও আলাদা। কেউ বিশ্বাস করবে?? বয়স বাড়ার সাথে গন্ধের কোন সম্পর্ক আছে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু গুগল করব, ইচ্ছে আছে।
আমরা বুড়ো-বুড়ি প্রায়ই হায়দ্রাবাদের আনাচে কানাচে বেড়াতে যাই। অনেক সময় শহর ছেড়ে কিছুটা মেঠো পথ ধরে চলতে থাকি। বুনো ঘাস আর মাঠের জলকাদার গন্ধ নিজের অজান্তেই মনটাকে দূরে উত্তর পূর্ব ভারতের এক নাম না জানা চা বাগানে নিয়ে যায়। কত স্মৃতি কত গল্প। মুখ না খুলেও কত গল্প করা যায় ওই সময় এই বুড়ো বুড়ি কে দেখলেই বোঝা যাবে। কিন্তু বেচারা গৌর কি বুঝে এই মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ কি জিনিষ? অগত্যা মন না চাইলেও ফিরে আসতে হয় কংক্রিটের শহরে।
এই তো কয়েকদিন আগেকার কথা। হঠাৎ ঘরে ঢুকে মনে হলো মায়ের গন্ধ পাচ্ছি। পরে বুঝলাম যে গিন্নী পন্ডস পাউডার মেখেছেন। আমার মাও ব্যবহার করতেন।  মায়ের আবার গন্ধ হয় না কি? আলবাৎ হয়। একশো বার হয়। ছোটবেলা আমি ভীষণরকম মা নেওটা ছিলাম। মায়ের সাথেই ঘুমাতাম। সারাদিনের কাজ শেষ করে যখন মা আসতেন আমি ঘুমের ঘোরেই বুঝতে পারতাম যে মা বিছানায় এসেছেন। এই ছোট ছোট গন্ধগুলো এভাবে তাড়া করে বেড়াবে আগে বুঝতে পারিনি।
আমাদের নাক আর স্মৃতির এরকম অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের আর একটা উদাহরণ। অফিস ফেরার পথে হঠাৎ মনে হলো কে যেন দুর্গাপুজোর গন্ধ নাকে ঢেলে দিল। বাইকটা বাধ্য হয়েই দাঁড় করলাম। পাশেই দেখলাম একটা শিউলি ফুলের গাছ। ব্যস, মন ব্যাটা চলে গেল বছর তিরিশ আগে। সপ্তমীর সকাল ছিল। মা ঘুম থেকে উঠিয়েই বললেন, "তাড়াতাড়ি স্নান করে নে, আমি শাঝিতে শিউলি আর স্থলপদ্ম তুলে রেখেছি, পদ্মপুর ক্লাবে দিয়ে আয়"। কি অনাবিল আনন্দই না ছিল। পেছনের গাড়িটা হর্ন না বাজালে বোধহয় টাইম ট্র্যাভেল চলতেই থাকত।
রক্তেরও গন্ধ আছে, ভীষণ গা গুলোয়। আমাদের বাগানের এক চা শ্রমিকের একবার পা কেটে গিয়েছিল। আমার মনে আছে পুরো রাত বমি করেছিলাম। মানুষ পোড়ানোর গন্ধেরও তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। হাত পটু হলে আর আত্মবিশ্বাস আসলে সেই ব্যাপারেও লেখব।
গন্ধ অত্যাচারের আরেকটা ছোট্ট গল্প শেয়ার করতে চাই। কোন একটা মন্দিরে বসেছিলাম (নাম মনে করতে পারছি না)। আচমকা মনটা ভয়ভীত হয়ে উঠল। ব্যস, মনের ব্যাক এন্ডের কাজ শুরু। একটা দুঃখজনক ঘটনায় গিয়ে সার্চ সমাপ্ত হল...আমাদের পেছনের বাড়িটা গোস্বামী কাকুর ছিল। উনার ছেলে কিশোর (ডাকনাম বাবু) আমার বন্ধু। কিশোরের এক নিঃসন্তান পিসেমশাই প্রায়ই আসতেন ওদের বাড়ীতে। সেইদিনও পিসি ও পিসেমশাই র সাথে দেখা হয়েছিল। খুব সম্ভব আমি তখন ক্লাস সেভেন এ পড়ি। হঠাৎ করেই পিসেমশাই অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন পুরো রাত মৃতদেহের পাশে থ্রি ইন ওয়ান ধুপকাঠি জ্বেলে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকে ওই ব্র্যান্ডটাই ব্যান্ড হয়ে গেল আমাদের বাড়িতে।  আচ্ছা, এই টাইম ট্র্যাভেল কিন্তু খুব কম সময়ের হয়। কিন্তু বেশ লাগে। অনেকটা টক ঝাল মিষ্টি আচারের মতো।
ভোজনবিলাসি হলে কিন্তু এই গন্ধাস্ত্রের হাত থেকে মুক্তি নেই। এই যেমন, প্রেশার কুকারে বাঁশ করুল সেদ্ধ হচ্ছে, কিংবা একটু ভাপে ইলিশ বা হোক না একটু পিঠে পুলি। মন কিন্তু মা, কাকিমা, জ্যাঠিমার কাছে পৌঁছে যাবেই।
পারফিউম বা সুগন্ধির গল্প না করলে কিন্তু এই ঘ্রান ভ্রমন সমাপ্ত করা যায় না। সদ্য কৈশোর বা যৌবনে কে না ব্যবহার করেছে এই বস্তুটা। আমার বাবু খুব সৌখিন ছিলেন এই বিষয়ে। বাবু আসাম থেকে ছুটিতে আসলেই আমার ডিউটি ছিল উনার সুটকেস খোলা। সুটকেস খুললেই এক দমকা হওয়ার মতো এক নাক বাবু বাবু গন্ধ। এখনও ভাবি একটা লোক কিভাবে এত পরিপাটি থাকতে পারতেন? প্রতিটা কাপড়ে সুগন্ধ। মনেট ব্যবহার করতেন। আজও সেই গন্ধ নাকে গেলে মনে হয় বাবু পাশেই আছেন। কিন্তু আমি ব্যবহার করি না। খুব ভয় হয়...
তখন ডিয়োডরেন্ট ছিল না, ছিল মনেট, পার্ক এভিনিউ, রজনীগন্ধা (যেটা বরযাত্রী যাবার সময় বেশি ব্যবহৃত হত)। বিয়ে বাড়িতে বা কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে এর যথেচ্ছ ব্যবহার হত। কোনটা উগ্র কোনটা বা ব্যবহারকারিনির মতোই মিষ্টি। মনে দাগ কেটে যেত। আজও রজনীগন্ধার গন্ধ নাকে পৌছালে মনটা চঞ্চল হয় বৈকি। আমার শাশুড়ি মাকে আজও দেখি গৌরের বালিশ জড়িয়ে ঘুমোতে। আসলে গন্ধ আমাদেরকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছে।

প্রাণের শহর ধর্মনগর

পাইলট ল্যান্ডিং এর ঘোষণা করার পর থেকেই তপুর মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। আজ থেকে প্রায় 20 বছর আগে শহর ছেড়েছিল। তখন ধর্মনগর একটি মহকুমা শহর ছিল মাত্র। আকাশ থেকে তার প্রিয় শহরকে দেখছিল। বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর নিজের চোখকে। কাজের সুবাদে পুরো দেশ চষে বেরিয়েছে তপু। অনেক শহর দেখেছে। তবু ধর্মনগর তাঁর নিজের শহর, প্রিয় শহর।
এই তো সেদিনের কথা, নাইট সুপার বাসে চেপে একদিন হাতে নিয়ে গুয়াহাটি যাচ্ছিল  দিল্লীর সম্পর্ক ক্রান্তি ট্রেন ধরতে। সেই দিন গুলো ভুলা যায়? বৃষ্টি হলে বাস নেই, পাহাড় লাইন এ মিটার গেজ ট্রেন বন্ধ। উফ!! কি যন্ত্রনা। এমনকি বাড়ী থেকে মোটর স্ট্যান্ড যেতেও ভরসা রিকশা। বর্ষার দিনে তো আস্ত ত্রিপুরাই বিচ্ছিন্ন বাকি দেশ থেকে।
দিল্লী বসেই তপু শুনেছিল ব্রড গেজ ট্রেন চালু হয়ে গেছে ত্রিপুরায়। কিন্তু জলজ্যান্ত এয়ারপোর্ট?
এইসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই একটা ছোট্ট ঝাকুনি দিয়ে হায়দ্রাবাদ ধর্মনগর ইন্ডিগো ডাইরেক্ট ফ্লাইটটা ল্যান্ড করল।
তপুর তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের চোখকে। সুদৃশ্য এয়ারপোর্ট আর আধুনিক লাউঞ্জকে বায়ে রেখে নিজের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে তপু ভাবছিল এখন একবার রাজুকে ফোন করা যাক। এখানে তো আর ওলা উবের পাব না।
রাজুর সাথে কথা বলতে বলতে তপু ভাবলো একটা কফি তো মন্দ হয় না। এয়ারপোর্টের বাইরে এসেই ক্যাফে কফি ডের একটা কফি অর্ডার করে তপু এদিক ওদিক দেখছিল তখনই রাজু কলব্যাক করল। বলল শোন, আজ তাজ ত্রিপুরায় ভি ভি আই পি মুভমেন্ট আছে। তো ট্রাফিক প্রায় স্তব্ধ। আমি লোকেশন শেয়ার করছি, তুই এয়ারপোর্ট ওয়াই ফাই দিয়ে উবের বুক করে চলে আয়। ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবি। তপুর ততক্ষনে ভিমরি খাওয়ার উপক্রম। ও AIIMS এর ব্যাপারে শুনেছিল। কিন্তু পাঁচতারা হোটেল? তাও তাজ ত্রিপুরা??? ধর্মনগরে? CCD র টাকা মিটিয়ে কোনমতে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, দাদা আজ কি কোন VIP এসেছেন ধর্মনগরে...
.
.
তপু ছোটবেলা একাই স্কুলে যেত। একদিন জ্বর আসায় মা সাথে ছিলেন। তখন রাঘনা তে BSF ক্যাম্প ছিল। ওই ক্যাম্পের এক অফিসার কে এয়ারলিফট করা হয়েছিল অসুস্থতার জন্য। সেই দিন তপু আজও ভুলে নি। BBI স্কুলফিল্ডে সেই লাল রঙের হেলিকপ্টার দেখার জন্য পুরো শহর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তপুও মার হাত ছেড়ে দৌড়ে গেছিল 'উড়ন্ত ফড়িং' দেখতে...
.
.
4 লেন রোড, সুদৃশ্য অট্টালিকা, মাল্টিপ্লেক্স গুলো  তপুকে যেন কিছু বলছিল। ড্রাইভার কিছু বলছিল, দেখে বিহারী মনে হল। স্পষ্ট হিন্দীতে বলল আপকা লোকেশন মে পহচনে মে থোড়া টাইম লাগেগা। তপু ততক্ষনে বুঝে গেছে যে IT পার্ক উদ্ঘাটনের জন্য মোদী আর ট্রাম্পের ধর্মনগর সফর আজ দেরী করিয়ে ছাড়বে। আর মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো লক্ষ্মণ (উবের ড্রাইভার) ততক্ষনে তপুকে জানিয়ে দিয়েছে যে ও ইচ্ছে করলেই রোড ওয়াইফাই বা উবের ওয়াইফাই ব্যবহার করতে পারে। তপু ল্যাপটপ খুলে কিছু জরুরি মেল করে নিল। লক্ষ্মনের গাড়ি যত শহরে ঢুকছে তত তপু বুঝতে পারছে কেন এয়ারপোর্ট টা কুমারঘাটে বানানো হয়েছে। চামটিলা তে AIIMS কে ডানদিকে রেখে গাড়ি বাঁদিকে মোড় নিল। লক্ষ্মণ আবার জিজ্ঞেস করল স্যার কোনদিকে যাব। IIT হয়ে গেলে একটু ট্রাফিক কম থাকতে পারে। ও বলে যাচ্ছিল IIT ফ্লাইওভার দিয়ে গেলে নাকি প্রায় 5 কিমি রাস্তা কম হবে। কোনমতে ঘাড় নেড়ে তপু সম্মতি দিল।
তপু মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের প্রিয় পদ্মপুরকে দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল একটা ভিডিও কল করে মৃদুলের সাথে কথা বললে কেমন হয়। মৃদুল প্রায়ই USA র বর্ননা দেয় ফেবুতে। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা বিশাল অট্টালিকার পাশে গাড়ি দাঁড়ালো। গেটের সামনে স্টিল দিয়ে লেখা Sunrise Apartment, Padmapur. রাজু গেটেই দাঁড়িয়ে ছিল। তপু গগনচুম্বী অট্টালিকার ফাঁক ফোকর দিয়ে নিজের বাড়িটা খোঁজার চেষ্টা করছিল। ওখানেই তো ছিল...

Note :: এটি একটি রম্য রচনা মাত্র। প্রিয় বন্ধু Vibgyor Colors এর লেখা পড়ে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটু চেষ্টা করলাম। ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।