আমার বাগানবেলার কথা লিখেছিলাম...
মার হাত ধরে এক নতুন শহরে ঢুকছিলাম। মিটারগেজ ট্রেনটা অন্যদিনের তুলনায় বেশ ধীরেই স্টেশনে প্রবেশ করছিল। তখন স্টেশনে এক অদ্ভুত হলুদ রঙের লাইট থাকত। কেমন যেন ভূতুড়ে। যদিও রেলের সবই আমার আজও ভুতুড়েই মনে হয়। খুব সম্ভব দেওয়াদা সাথে ছিল, তাই ততটা কষ্ট হয়নি ঘরে পৌঁছাতে। আমাদের প্রথম আস্তানা হয়েছিল নুতনপট্টি, তুষার কাকুর ঘরে। অবশ্যই ভাড়াটিয়া হিসেবে। বাগানের নির্মল পরিবেশ ছেড়ে, মাটির ঘর ছেড়ে সোজা দালান বাড়ী। সত্যি বলব মন্দ লাগছিল না। মায়ের সংসার সাজানো দেখছিলাম। কিভাবে স্বল্প জিনিষ দিয়ে সুন্দর করে ঘর সাজানো যায় তা বোধহয় মার থেকে ভালো কেউ জানত না। স্টিলের থালাকে উল্টো করে অরেঞ্জ কোয়াশের বোতল দিয়ে যে কেউ রুটি বানাতে পারে তা নিজে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল হত।
আগেই বলেছিলাম বাবু আসাম থাকতেন। তাই বেতনের অপেক্ষা করতে হত। তখন বাবু আর মার একটা জয়েন্ট একাউন্ট ছিল ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক এ। ওখানে পাসবুক দেখিয়ে জানতে হত যে টাকা এসেছে কি না। যেদিন টাকা ঢুকত খুব আনন্দ হত। মার সাথে যেতাম কুসুমালয়ে। সেই দোকানের গন্ধ আজও মনে আছে। তখন বন্ধু বলতে কেউ ছিল না।
যাইহোক একদিন স্কুলে ভর্তি হলাম। ধর্মনগর জুনিয়র বেসিক স্কুল। অনেকখানি আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা, লজ্জা নিয়ে ক্লাস থ্রি তে বসলাম। বাপ্পা সেন আর সুদীপ্ত দাস আমার প্রথম বন্ধু। আজও সেই দিন খুব স্পষ্ট মনে আছে। ধীরে ধীরে আরো বন্ধু হল। বেশ নাম ও হল স্কুলে। না না পড়াশুনার জন্য নয়। জানতে পারলাম যে রিনি পাল ফার্স্ট গার্ল। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে মেয়ের অভাব ছিল না। পৃথ্বীরাজ ও আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেল। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি রিনি ও পৃথ্বীরাজ যথাক্রমে গীতা দিদিমণি ও শিউলি দিদিমনির মেয়ে ও ছেলে। রিনির সাথে আমার কথাবার্তা প্রায় হতই না। আমি অন্তত মনে করতে পারছি না। কারন কিন্তু কিছুই নয়। যদিও রিনির সাথে এখন ফেবুতে কথাবার্তা হয়। একটা কথা অকপটে স্বীকার করব। বন্ধু অনেক ই হয় বা সবাই হয় কিন্তু মনের বা আত্মার সাথে মিল খুব কমই হয়। এই কানেক্ট হয়েছিল সুদীপ্ত আর বাপ্পার সাথে আর পরে পৃথ্বীরাজ এর সাথে। আর মেয়ে বন্ধুদের মধ্যে চৈতালি, মৌটুসী আর সুকৃতি আচার্য্য। বাকিদের খুঁজে পেলেও সুকৃতিকে আর কখনও পাই নি। যাইহোক হই হই করে পড়াশুনা, খেলাধুলা চলতে থাকল। তখন বিবিআই স্কুল মাঠে পদ্মজং মেমোরিয়াল শিল্ড ফুটবল টুর্ণানেন্ট হত। আসাম, মনিপুর, মিজোরাম এমনকি বাংলাদেশ থেকেও টিম আসত। কিছু না বুঝলেও মাঠে যেতাম খেলা দেখতে। সেসময় পুরো শহরে একটা উৎসব এর সূচনা হত। রিক্সায় মাইক লাগিয়ে কোন দলের খেলা তা ঘোষণা করা হত। অবাক চোখে দেখতাম, রিক্সার পেছনে ছুটতাম। সত্যি কি অফুরন্ত আনন্দ।
তারপর একটা অজানা কারণে আমরা নুতনপট্টি থেকে হাসপাতাল রোডে শিফট হয়ে যাই। ততদিনে বাগানকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। নুতন শহর, নুতন বন্ধু, নুতন পরিবেশ। যদিও আমার জন্য নুতন ছিল না। বাবুর চাকরির দৌলতে এই ছোট্ট বয়সেই আমার প্রায় আসাম ভ্রমন শেষ ছিল।
দেখতে দেখতে পূজা এসে গেল। এই আমার প্রথম শহরের পূজা দেখা। এত চমক, সাজ সজ্জা, আলো। চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মায়ের হাত ধরে এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল। বাবু পূজার ছুটিতে আসতেন। আমার নুতন জামা কাপড় হত, মার শাড়ি, কিন্ত একটা অজানা কারণে বাবুর সেই পুরনো শার্ট। কারনটা আজ বুঝি।
ফিরে আসি স্কুলে। তখন ঠিক স্কুলের সামনেই ছিল বিশালাকায় কিছু গাছ। পরবর্তী সময়ে নগরোণ্নয়নের নামে ওদের বলি দেওয়া হয়। ওই গাছের নিচেই সুবীর কাকুর আচার, লজেন্স এর দোকান। কখনও 50 পয়সা বা 1 টাকা হাত খরচ পেতাম। আচার, লজেন্স বা রঙ বেরঙের আইসক্রিম খেয়ে খেয়ে বাড়ী ফিরতাম। এই আইসক্রিম কিন্তু আজকের আইসক্রিম নয়। এটাকে বোধহয় বরফ বলাই ঠিক হবে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি সেই স্বাদ বা আনন্দ আজকের আইসক্রিমে নেই। নুতন ক্লাসের বই কেনা বা স্কুল পোষাক কেনাও ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। বইয়ের জন্য যেতাম উমা বুক স্টল বা রয়েল লাইব্রেরী। অভাবের সংসার হলেও মা বাবু বই কিন্তু নুতন কিনে দিতেন। পুরোন বই ও পাওয়া যেত। সে কি উত্তেজনা বই কিনতে গিয়ে। 3-4 দিন তো বলতে গেলে ঘুম আসত না চোখে। আর বইয়ের সাথে কলম, কাঠ পেন্সিল, ইরেজার বা রাবার, পেন্সিল কাটার ইত্যাদি ও থাকত। বইয়ের গন্ধ, রঙ, আকার, মলাট লাগানো আর সাথে তড়িৎ গতিতে পড়ে ফেলা। স্কুলে বই নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার থাকত এলুমিনিয়ামের বাক্স আর আমার ছিল একটা প্লাস্টিকের বাক্স। যেটা আমাকে সবার থেকে একটু আলাদা করত। পোষাকের জন্য গোপীনাথ স্টোরস। জানিনা আজ দোকানটা আছে কি না। খয়েরি হাফ প্যান্ট আর সাদা শার্ট।
আমরা স্কুলে নানা রকম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। ট্যাবলু তার মধ্যে অন্যতম। আমরা সাজতাম নানা সাজে, কেউ গুজরাটি, কেউ মারাঠি, কেউ মুসলমান। উচ্চতার জন্য আমি পাঞ্জাবী সাজতাম। তারপর স্যার আর দিদিমণিদের তত্ত্বাবধানে পথ পরিক্রমা। গান,আবৃত্তি সবেতেই অংশগ্রহণ করতাম কিন্তু নিজের প্রতিভা বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। একবার একটা নাটক করে অবশ্য কিছু প্রশংসা কুড়িয়েছিলাম। একলব্যের বন্ধু বসন্তের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমার মনে আছে এক সাঁওতাল ছেলের ভূমিকা ছিল কিন্তু মেকআপ ম্যান ভুলবশত আমাকে রাজপুত্রের মত সাজিয়েছিল। অবশেষে ওই সাজেই অভিনয় করেছিলাম।
মা বাবু হঠাৎ করেই একদিন আমাকে পদ্মপুর নিয়ে গেলেন। বাবুর মামার বাড়ী সেখানেই ছিল। ওখানে গিয়ে প্রথম জানলাম যে আমাদের নিজস্ব ঘর ওখানেই হচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে কুটির, "গুরু দয়াল কুটির"। আমার বাবু দাদুর নামে নামকরণ করেছিলেন। আমার নুতন ঠিকানা। প্রেমানন্দ কাকুর ধানের জমি ছিল। ওখানেই পুকুর খুদাই করে ভিটে তৈরী হল। বাঁশের বেড়া, ছনের ছাউনি। সে এক স্বপ্নের ভুবন। পাশেই মৃতপ্রায় জুরি নদী। বাঁশ ঝাড়ের নীচে কাঁচা শৌচালয়। আর সদ্য বর্ষায় স্ফীত পুকুর। একদিন মাছের পোনা ফেলা হল। মা খুব ভালো বাগান করতে পারতেন। খুব তাড়াতাড়ি গুরু দয়াল কুটির আশ্রমের মত হয়ে গেল। উর্বর জমিতে ফুল ও সব্জির চাষ ভালোই হত। কতরকম ফুল ফোঁটাতেন মা। চন্দ্র মল্লিকা, পদ্ম, 9 ও ক্লক, সন্ধ্যামালতি, গাঁদা। ফুলের গাছ লাগানো থেকে শুরু করে কলি ধরা ফুল ফোটা অব্দি আমি সাক্ষী থাকতাম।
বর্ষাকাল আর বৃষ্টি আমার চিরপ্রিয়। তুফানের সময় কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বাতাসের তান্ডবে বাঁশগাছগুলো কেমন মাটি ছুঁই ছুঁই করত। গোস্বামী কাকুর বাড়ির পেছনে একটা শিমুল তুলার গাছ ছিল। কালো আকাশে শ্বেত শুভ তুলার উড়ে আসা দেখতাম হা করে। তারপর চলত বৃষ্টির তান্ডব। আর আমি মায়ের সাথে গুটি গুটি বিছানায় শুয়ে বৃষ্টির শব্দ উপভোগ করতাম। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে পৃথিবীকে সিক্ত হতে দেখতাম। নিজে শুকনো থেকে বৃষ্টি দেখাও কিন্তু খুব রোমাঞ্চকর। বৃষ্টি শেষ হলে আবার গাছ দেখতে বেরোতাম। তখন যেন সব গাছ গাছালিকে খুব খুশী লাগত। একদিন এইরকম বৃষ্টি শেষে মার সব্জী খেত দেখছি। হঠাৎ দেখি শসা আর কাকরুল গাছে দু দুটো মধ্যম আকারের নব্য সব্জী। হয়তো কোন পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। এই আনন্দ অনেকটা গুপ্তধন পাওয়ার মতোই। খুব কাছে গিয়ে শসাটাকে দেখলাম। অনেকটা ছোট্ট হাঁসের ছানার মতোই। খুব কম সব্জী ই আমরা বাজার থেকে কিনে আনতাম। তবে চালের জন্য যেতাম। 2 টাকা 25 পয়সার চাল কিনেছিলাম প্রতি কেজি।
মা হাঁসের ছানা কিনেছিলেন। চার টা মেয়ে হাঁস আর একটা ছেলে। এবার আমার পুরো মন ওদের দিকে। ওদের ঘর খুলে বের করা, পুকুরে পাঠানো,খাওয়া দেওয়া আবার পুকুর থেকে ঘরে উঠানো। ততদিনে পুকুরে কচুরিপানা হয়ে গেছে। হাসগুলো ও বড় হচ্ছিল। একদিন ঘর খুলে হাঁস বের করতে গিয়ে দেখি চার চারটা ডিম। আমার আজও ডিম দেখলে ওই দিনের কথা মনে পড়ে। উত্তেজনায় এত জোরে চিৎকার করেছিলাম যে আশেপাশের লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাঁশঝাড়ের পাশেই একটি কলাবাগান ছিল। পরে আরেকদিন ঐ কলাবাগানে প্রায় 12টি ডিম পেয়েছিলাম। সেও গুপ্তধন প্রাপ্তির সমান।
দেখতে দেখতে আমিও বড় হতে থাকি। মর্নিং স্কুল ছিল। আমি পৃথ্বীরাজ, সুদীপ্ত আর রাজুর সাথে বড় হতে থাকি। পৃথ্বীরাজ আমাকে সাইকেল চালানো শেখায়। আমাদের আরেকটা নিয়ম ছিল বন্ধুদের বাড়ীতে থাকা। যেটা আজকাল আর দেখি না। এটা বেশ পালা করেই চলত। আমি ঘুম থেকে উঠে নিজেই টিফিন বানিয়ে পদ্মপুর থেকে হেঁটে স্কুলে যেতাম।
বাবু পুনরায় আসাম চলে গেলেন। ততদিনে আমি বাজার করা, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, রেশন তোলা সব শিখে গেছি।
আমি টুক টুক করে সারা বছর পড়তাম। সন্ধ্যা হলে হ্যারিকেন জ্বেলে মাটিতে চালের বস্তায় বসে বই পড়তাম। মা রান্না করতেন। সেই শব্দ আর গন্ধ খুব মিস করি। এই বাড়িতেই একদিন বিদ্যুৎ সংযোগ হল। প্রায় দুদিন 40 পাওয়ারের বাল্ব দেখেই কাটিয়ে দিই। আমার মনে হয়েছিল দুর্গাপূজা বোধহয় আমার বাড়িতেই হবে।
(চলবে)
Wednesday, 31 October 2018
ছেলেবেলা
প্রবাসী পূজা
ভাবছিলাম পূজার ক'টা দিন বাঙালিয়ানা নিয়ে কাটাব। যেই ভাবা সেই কাজ, আমরা আর আমাদের রাম পিয়ারী নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হায়দ্রাবাদ শহরে তো আর বাঙ্গালী কম নয়। তো তৃতীয়া থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু। বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক সঙ্ঘ, হায়দ্রাবাদ বাঙ্গালী সমিতি, হায়দ্রাবাদ কালীবাড়ি সায়বারাবাদ বাঙ্গালী সমিতি ইত্যাদি ঘুরেই চলছি। আমাদের একটা নিজস্ব গ্রুপ আছে, Sylhetis in Hyderabad। আমরা দেখা করছি, ভোগ খাচ্ছি। অনাবিল আনন্দ যাকে বলে। পূজা মন্ডপের আশেপাশে বসে বাঙ্গালীদের টুকরো টুকরো কথাগুলো কিন্তু বেশ লাগে। কখনও স্বামী স্ত্রী বা মা মেয়ে বা মা ছেলের কথোপকথন। বাংলা তো নয় এ তো আস্ত শশী থরুর ছুঁড়ে মারছে একে অপরের দিকে। অনেক শব্দ বোধগম্য হলেও স্বল্পশিক্ষার দৌলতে বেশিরভাগই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। কি রকম যেন অসহায় বোধ করলাম। ছেলে মোবাইল এ ব্যস্ত আর গিন্নী একটু অন্যমনস্ক। এই সুযোগে অনলাইন অভিধান খুলে বসলাম। হায়দ্রাবাদ পূজার একটা বৈশিষ্ঠ আছে। এখানে থিম পূজা নেই। অনেকটা গ্রামদেশের পূজার মত। একটি নির্দিষ্ট পরিসীমায় সমস্ত দোকানপাট, বইয়ের দোকান, খাদ্যের মেলা মানে একেবারে কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট। কিরকম যেন হীনমন্যতায় ভুগে বইয়ের দোকানে গেলাম। হাদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে দেখছিলাম। এমন সময় দুটো পরিবার দেখলাম একসাথেই ঢুকলেন। আমি হতচকিত হয়ে ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিলাম। ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়ে তাঁর মাকে স্পষ্ট ভাবে বলল, "Mom, can I have some books?" আমি কিন্তু খুশী ই হলাম। কেন জানিনা ছোট্ট ছেলে মেয়েরা বই কিনলে বেশ লাগে। নিজের অজান্তেই আমার চোখ মায়ের দিকেই গেল। একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। উনি ততটাই সপ্রতিভ ভাবে উত্তর দিলেন, "Baby, you know na, you can't read bengali? Why waste money?" আবার কেমন জানি মিইয়ে গেলাম।
ভাবলাম একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখি। বেশ লাগছিল। বিভোর হয়েই শুনছিলাম। হঠাৎই কানে কি যেন আছড়ে পড়ল। বুঝলাম আচ্ছা মঞ্চ থেকে এংকর এর শব্দ। উনি বাংলাটা ঠিক ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। উনি যদিও ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু, হিন্দী, তেলেগু, ইংরেজি ও দুর্ভাগা বাংলা মিলেমিশে কর্ণকুহরে যেটা প্রবেশ করছিল সেটা পূজার সময় নিতে পারছিলাম না। যাইহোক আয়োজক রা কিন্তু ঠিকই বুঝে গেছেন যে উপস্থিত বাঙ্গালী প্রজন্ম এই বস্তাপচা পল্লীগীতি, বাউল ঠিক খাচ্ছে না। যথারীতি কর্পোরেট প্ল্যান বি হাজির হলেন ইংলিশ আর হিন্দী গানের ডালা নিয়ে। গানকে সাপোর্ট করার জন্য কোন মেশিনের অভাব ছিল না। আমরা তানপুরা, হারমোনিয়াম আর তবলা চিনতাম। কিন্তু মশাই, আমি হলেম প্রাচীন। ওদের মেশিন ফিট করা দেখে খুবই গর্ব হচ্ছিল। বাব্বা, ঘন্টা দুয়েকের যুদ্ধের পর সব ঠিক হল। রকেট সায়েন্স বোধহয় একেই বলে। যথাসময়ে শিল্পী এলেন, ড্রামসেট, ইলেকট্রিক গিটার উনাকে স্বাগত জানাতে কোন কার্পণ্য করছিল না। আমি কিরকম যেন একটু অসুস্থ ফিল করছিলাম। একটু অধৈর্য্য ও বোধহয়। এইবার তাহলে গান শুনব। শিল্পী মাইক হাতে নিয়ে কোমর না বেকিয়ে শরীরটাকে যতটুকু সম্ভব পেছনে নিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে বললেন, "Hyderabad....Do you want to rock?"। প্রায় পরেই যাচ্ছিলাম। তীব্র শব্দ আর ততোধিক আলো। আমি ঘর্মাক্ত অসুস্থ শরীরটাকে টানতে টানতে শুনতে পেলাম, গিন্নী বলছেন, "কিতা গো, কই যাও?"
ভাবলাম একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখি। বেশ লাগছিল। বিভোর হয়েই শুনছিলাম। হঠাৎই কানে কি যেন আছড়ে পড়ল। বুঝলাম আচ্ছা মঞ্চ থেকে এংকর এর শব্দ। উনি বাংলাটা ঠিক ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। উনি যদিও ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু, হিন্দী, তেলেগু, ইংরেজি ও দুর্ভাগা বাংলা মিলেমিশে কর্ণকুহরে যেটা প্রবেশ করছিল সেটা পূজার সময় নিতে পারছিলাম না। যাইহোক আয়োজক রা কিন্তু ঠিকই বুঝে গেছেন যে উপস্থিত বাঙ্গালী প্রজন্ম এই বস্তাপচা পল্লীগীতি, বাউল ঠিক খাচ্ছে না। যথারীতি কর্পোরেট প্ল্যান বি হাজির হলেন ইংলিশ আর হিন্দী গানের ডালা নিয়ে। গানকে সাপোর্ট করার জন্য কোন মেশিনের অভাব ছিল না। আমরা তানপুরা, হারমোনিয়াম আর তবলা চিনতাম। কিন্তু মশাই, আমি হলেম প্রাচীন। ওদের মেশিন ফিট করা দেখে খুবই গর্ব হচ্ছিল। বাব্বা, ঘন্টা দুয়েকের যুদ্ধের পর সব ঠিক হল। রকেট সায়েন্স বোধহয় একেই বলে। যথাসময়ে শিল্পী এলেন, ড্রামসেট, ইলেকট্রিক গিটার উনাকে স্বাগত জানাতে কোন কার্পণ্য করছিল না। আমি কিরকম যেন একটু অসুস্থ ফিল করছিলাম। একটু অধৈর্য্য ও বোধহয়। এইবার তাহলে গান শুনব। শিল্পী মাইক হাতে নিয়ে কোমর না বেকিয়ে শরীরটাকে যতটুকু সম্ভব পেছনে নিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে বললেন, "Hyderabad....Do you want to rock?"। প্রায় পরেই যাচ্ছিলাম। তীব্র শব্দ আর ততোধিক আলো। আমি ঘর্মাক্ত অসুস্থ শরীরটাকে টানতে টানতে শুনতে পেলাম, গিন্নী বলছেন, "কিতা গো, কই যাও?"
Monday, 1 October 2018
চিন্তা
ফ্লাইট টা টেকঅফ করতেই বুঝতে পারলাম যে মনটা আসলে তোমার পাশেই থাকে। আমিই শুধু ছন্নছাড়ার মত ঘুরে বেড়াই। আকাশে বাতাসে এয়ারপোর্টে স্টেশনে তুমিই তুমি। আমার ক্লায়েন্ট কল মিটিং শাটল্ ক্যাবেও। কি করে? কেন? আমি কি তবে ভবঘুরে? চিন্তা করতেই কি সময় শেষ? হাতের কফি কাপটা হাতেই রয়ে গেল। আবছা শুনতে পেলাম উই আর এপ্রোচিং চেন্নাই এয়ারপোর্ট । মনটা ভবঘুরেই থেকে গেল।
বউ
হারা দিন কাম করি, ঘাম ঝরে পাও,
ঘর ও আইলেউ বউয়ে কয় দোকানো যাও।
ট্রাফিক আর গরমে আমি নাজেআইল,
বউয়ে কয় ঘর ও নাই চাউল আর ডাইল।
তাড়াতাড়ি যাও তুমি মারওয়ারী দোকানো,
আনিও চাউল আর পারো যদি চিকেন ও।
খোঁচা মারি কইলাম আমি, শেষ নি তোমার লিস্টি,
মুখ ঝামটা মারিয়া কয় লাগবো বুলে মিষ্টি।
কোনমতে থলি লইয়া বাইরে দিলাম পাও,
পিছে তাকি ডাকিয়া কয় ফর্দ লইয়া যাও।
চাউল, ডাইল, তেল মশলা কোনতা নাই ঘর,
জিগাইলাম হারাদিন ঘর কিতা কর।
ফেসবুক আর হোয়াটসআপ খুব মনো থাকে,
সংসার ও মন দেও ওতার ফাঁকে ফাঁকে।
নাক মুখ ফুলাইয়া বুড়ি অউ যে চুপ মারল,
ঘুরাইয়া ফিরাইয়া মাতে অখন আমার কাম সারল।
ঘর ও আইলেউ বউয়ে কয় দোকানো যাও।
ট্রাফিক আর গরমে আমি নাজেআইল,
বউয়ে কয় ঘর ও নাই চাউল আর ডাইল।
তাড়াতাড়ি যাও তুমি মারওয়ারী দোকানো,
আনিও চাউল আর পারো যদি চিকেন ও।
খোঁচা মারি কইলাম আমি, শেষ নি তোমার লিস্টি,
মুখ ঝামটা মারিয়া কয় লাগবো বুলে মিষ্টি।
কোনমতে থলি লইয়া বাইরে দিলাম পাও,
পিছে তাকি ডাকিয়া কয় ফর্দ লইয়া যাও।
চাউল, ডাইল, তেল মশলা কোনতা নাই ঘর,
জিগাইলাম হারাদিন ঘর কিতা কর।
ফেসবুক আর হোয়াটসআপ খুব মনো থাকে,
সংসার ও মন দেও ওতার ফাঁকে ফাঁকে।
নাক মুখ ফুলাইয়া বুড়ি অউ যে চুপ মারল,
ঘুরাইয়া ফিরাইয়া মাতে অখন আমার কাম সারল।
আমার বাগানবেলা
তিলভুম, টিরিমটি ও মেদলি এই তিনটি নাম আপনাদের কাছে অপরিচিত
হলেও আমার স্মৃতির অনেকটা জড়িয়ে আছে এই ত্রিনাম। এই তিনটিই হলো অধুনা করিমগঞ্জের
অন্তর্গত অতি মনোরম চা বাগান। তারমধ্যে টিরিমটি আমার জন্মস্থান। এই জায়গাতিনটে
আলাদা হলেও মোটামুটি পাশাপাশিই বলা যায়। যারা
আসাম থেকে ত্রিপুরা ট্রেনে যাতায়াত করেন তারা নিশ্চয়ই তিলভুম রেল স্টেশন দেখেছেন।
আমার বাবা আসাম
বনবিভাগে চাকুরী করতেন । বাবার ঘন ঘন স্থান বদল হতো যার জন্য আমি আমার জেঠু ও বড়মার সাথে এই বাগানেই
থাকতাম। আমার জেঠু এই তিলভুম চা বাগানে কর্মরত ছিলেন। আমাদের একটা মস্ত কোয়ার্টার
ছিল। মাটির ঘর, বড় বড় রুম। একটা ছোট টিলার উপর ছিল এই কোয়ার্টার। একটা কুয়ো ছিল।
সেই শীতল ও পরিষ্কার জল এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়না। আজো বোধহয় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই তো
১৯৮৪-৮৫ সালে তো প্রশ্নই উঠে না।
আমার জেঠু খুবই
রাশভারী লোক ছিলেন। আর সবাই উনাকে কেরানিবাবু বলেই ডাকতো। সারাজীবন উনাকে ধুতি ও
পাঞ্জাবীতে দেখলাম। উনার একটা নিজস্ব বেডরুম কাম অফিস ছিল। একটা ঢাউস খাতা
প্রতিদিন কেউ না কেউ বয়ে নিয়ে আসত। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতেন উনি। সবাই উনাকে
বাঘের মত ভয় পেত। আমার বাবাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু আমার সব আবদার ছিল উনার
কাছেই। প্রায়ই উনার সাথে ঘুমাতাম। পরীক্ষার ফল খারাপ হলেও উনার
টেবিলে মার্কশিট চাপা দিয়ে রাখতাম। কিন্তু জেঠু ছিলেন নারকেলের মতো। বাইরে শক্ত
ভিতরে নরম। যত বড় হয়েছি ততই বুঝতে পেরেছি।
আমাদের মস্ত খেত
ছিল। ওই টিলাতেই বাগানের শ্রমিকরা জমি তৈরি করে দিত। এমন কোন সবজী ছিল না যে
আমাদের খেতে হত না। জমি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত আমি ওদের সাথে
থাকতাম। ওদের নাম ছিল বুধুয়াদা, লক্ষ্মীন্দরদা, দেওয়াদা, লক্ষ্মীদি। লক্ষ্মীদি
আমার মায়ের মতই ছিলেন। দেওয়াদা আর লক্ষ্মীদি স্বামী স্ত্রী। ওদের ছেলে মেয়েরা আমার
বন্ধু। সবাই মিলে খুব ফুর্তি করে ফসল কাটতাম। আমার চোখ থাকত আলু খেতে। মাটি খুঁড়ে
আলু বের করাটা আমার কাছে গুপ্তধন পাওয়ার মত মনে হত। এই বাগানবাড়ীতে কি ছিল না। আম,
কাঁঠাল, গোলাপজাম, ভুবি, পেয়ারা, লিচু। জেঠু ও বড়মা দুজনেই স্বরুপানন্দের (বাবামনির) দীক্ষিত ছিলেন। প্রায়ই আমাদের ঘরে
উপাসনা হত। সে কি আনন্দ বলে বোঝান যাবে না। বিশাল ফুল বাগান থেকে ফুল তুলতাম। পুরো
ঘর পরিষ্কার করা হত। আমি একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে উৎসব থেকে উৎসবের প্রস্তুতি
অনেক বেশি আনন্দদায়ক। বাগানবাড়ীর পিছন দিকটা ঢালু ছিল। ওখানটাতেই ছিল মস্ত গোয়ালঘর।
মোট ১৪ টি গরু ছিল আমাদের। আমার প্রিয় গরুর নাম ছিল টিকলি গাই। সবকটার নাম ছিল।
কিন্তু টিকলি আর কাল গাই এর নাম মনে আছে। আর ছিল অনেকগুলো ছাগল আর লালি। একটা বুড়ো
ছাগল ও ছিল। আমি ওই ছাগলের দুধ খেয়ে নাকি
বড় হয়েছি। মায়ের কাছে শোনা। যখনই সুযোগ পেত আমাকে আদর করে যেত ওই ছাগলটা। আর লালি আমার আদরের কুকুর। লালি আমার জীবনে কি
ছিল সেটা একটা লাইন দিয়ে বলব। আমি লালিকে প্রনাম না করে পরীক্ষা দিতে যেতাম না।
আমাদের একটা ময়না পাখীও ছিল। যদিও ওর কথা বেশী মনে নেই। প্রকৃতির সাথে থাকলে কোন
এলার্ম এর প্রয়োজন হয়না। ভোর হলেই অসংখ্য পাখীর কোলাহলে ঘুম ভেঙ্গে যেত। শালিক,
চড়ুই ওরা যে কি কোলাহল করতে পারে তা বোধহয় নতুন প্রজন্ম কোনদিন জানতেও পারবে না।
খুব বিরক্ত লাগত আর আজ ওদের খুঁজেও পাই না। আরেকটা অদ্ভুত প্রানি ছিল, আমরা কক্ক
বলেই চিনতাম। ত্রিসন্ধ্যার সময় যেন ঠাকুর ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর কথা মনে করিয়ে দিত
ওদের ডাক। আর ওদের ডাক কোনদিন শুনলাম না। ওই গোলাপজামের মতোই হারিয়ে
গেল।
তো এইভাবে গাছ,
ফুল, ফল, সবজী খেত, গরু, পাখী ও প্রকৃতি নিয়েই চলছিল আমার জীবন। ধীরে ধীরে আমার
গণ্ডি কোয়ার্টার থেকে বাইরে বেরোতে শুরু করল। আমি স্কুলে গেলাম। কোনাগাও নিম্ন
বুনিয়াদি বিদ্যালয়। একটা বটগাছের নীচে কুঁড়ে ঘর। কাঁঠাল গাছের তক্তা দিয়ে তৈরি
বেঞ্চ। চারদিকে জঙ্গল আর ঠিক মাঝখানে আমার স্কুল। আমার প্রথম শিক্ষক চূড়ামণি
স্যার। আজ জানিনা কোথায় আছেন। আমার প্রথম বান্ধবী শিল্পী নাথ। শিল্পীর সাথে পরে
দেখা করেছিলাম কিন্তু স্যার তখন করিমগঞ্জে ছিলেন। শিল্পীর এখন ৩ ছেলে। ঘোর
সংসারী যাকে বলে। পড়া শেষ করেই ছুট মাঠে,
জঙ্গলে। তখন আমরা স্লেট ব্যবহার করতাম। আর একটা জংলী ফল দিয়ে স্লেট পরিষ্কার
করতাম।
স্কুল থেকে বাড়ি
ফেরার পথে রেল লাইন ক্রস করতে হত। আমি আর শিল্পী রেল লাইনে কান পেতে শুনতাম রেল
আসছে কি না। রেল লাইনের পাশেই ছিল শিল্পীর বাড়ি। ও ঠিক বুঝে যেত। একটা রেল গেইট
ছিল আর গেটম্যান কাকু জেঠুর বন্ধু। একদিন আমি আর শিল্পী রেল লাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে ট্র্যাক এর উপর সাজিয়ে রেখেছিলাম।
আর দূর থেকে দাড়িয়ে দেখছিলাম যে কিভাবে ওই পাথরগুলো গুড়ো হয়ে যায়। আমি আর শিল্পী
ছাড়াও গেটম্যান কাকু এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। পরে যথারীতি উত্তম মধ্যম খাই জেঠুর হাতে। ওইদিন রেল ড্রাইভার ও বকা দিয়েছিলেন চলন্ত ট্রেন থেকে। পরে বুঝতে
পারি কি বিপদজনক ছিল এই খেলা। ট্রেন দেখার কি উত্তেজনা সে বলে বোঝান যায় না।
বুধবার ছিল
হাটবার। যেদিন জেঠুর হাতে উত্তম মধ্যম খেতাম সেদিন থেকে আমি বুধবারের অপেক্ষা
করতাম। হাটে দানাদার নামের একটা মিষ্টি পাওয়া যেত। আর স্বান্তনা পুরস্কারের নামে
ওইটা ছিল আমার পাওনা। হাটটাও একটা প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগানের। মস্ত বড় একটা খালি
মাঠের একপাশে নদী, পাশেই মেঠো রাস্তা আর তারপরেই ধান খেত। ধান খেতের পরেই রেল
লাইন। আর নদীর অপারেই ছোট্ট পাহাড় আর তার উপর শিব মন্দির। একটা বাঁশের সাঁকো দিয়ে
ওই ওপারে গিয়ে শিব মন্দিরে যাওয়া যায়। ওই একদিন ই পারমিশান মিলত মন্দির যাওয়ার।
আমি আর শিল্পী উপরে উঠে হাট আর রেল লাইন দেখতাম। হাটে কি ছিল না। হাস, মুরগি, গরু,
ছাগল থেকে শুরু করে, হরেক মাল, দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিষ, কাপড় চোপড়, বিস্কুট,
সবজী, মাছ সব। বিকেল ৩ টা থেকে ৬ টা অব্দি সে কি অনাবিল আনন্দ। নরোত্তম কাকু যদিও একটু আপ্রাসঙ্গিক কিন্তু উনি
আমাদের মুখি যোগান দিতেন। উনার খেতের মুখি মানে মাখনের মত নরম। জেঠুর খুব প্রিয়
ছিল। আর রহিম কাকু পাথারকান্দি থেকে মাছের যোগান দিতেন। সব থেকে ভালো মাছ টা আমাদের বাড়িতে আসবেই।
তিলভুমের গল্পতে
যদি চাবাগানের বর্ণনা না দেই তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চুরাইবাড়ি পেরিয়েই
বাদিকের রাস্তাটাই তিলভুমের রাস্তা। পুরোদস্তুর মাটির রাস্তা। আর দুপাশে চা বাগান।
বাগান তো নয় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো। চা গাছকে ছায়া দেয়ার জন্য বড় বড় কৃষ্ণচুড়া,
শিরিশ গাছের মেলা। লাল সবুজের স্বর্গ। মহিলা চা শ্রমিকরা গান গেয়ে কচি পাতা তুলে
নেয় নিজের ঝুড়িতে। রাস্তার দুপাশেই বাগান। কিছুদুর এগোলেই একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদী।
বাগানের সাহেব আর ট্র্যাক্টর এর জন্য একটা কাঠের ব্রিজ বানানো আছে। আমার টিকলি গাই
এই ব্রিজে চাপত না। বোধহয় কোন অজানা ভয় ছিল।
এই নদীতে
বর্ষাকালে বাঁশের চাটটা চলত আর কলাগাছের ভুর। বাড়িতে না জানিয়ে অনেক চড়েছি
বুধুয়াদার দৌলতে। এই চা বাগানে ঘুরতে ঘুরতে কত পাখীর বাসা ও বাচ্চা দেখলাম। গাছের কোটরে হাত ঢুকিয়ে কত
পাখীর বাচ্চা বের করলাম তার ইয়ত্তা নেই। বন্যাকে বাগানের শ্রমিকরা গোল্লা বলত। তখন
ঘর থেকে বেরোনো নিষেধ। আর আমি উঠোনে ছোট্ট বাধ বানিয়ে কৃত্রিম গোল্লা বানাতাম।
বাগানের আর একটা
উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লেবার লাইন। মানে চা শ্রমিকদের বাসস্থান। আমাকে খুব আকর্ষিত
করত। ছোট ছোট দোকান থাকত। ওরা খুব কম পরিমাণে জিনিষ কিনত। ছোট্ট বোতলে তেল, অল্প
ডাল এইরকম। বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে আটা, কেরোসিন দেওয়া হতো। আর মাঝে মাঝে সিনেমাও
দেখান হত। আমার প্রথম সিনেমা প্রেম প্রতিজ্ঞা। অনেকটা স্বদেশ সিনেমার মতোই। মা,
বড়মা, বৌদি র সাথে হা করে দেখেছিলাম। জেনারেটর দিয়ে চালানো হত এই সিনেমা।
বাগানেও দুর্গা
পুজো হতো। কাপড়ের দোকান বসত। সবাই এই সব দোকান থেকেই কাপড় কিনত। কিন্তু আমরা
ট্রেনে চেপে করিমগঞ্জ যেতাম। ট্রেনে আবার জানালার পাশে বসার উপায় নেই। কয়লার ইঞ্জিন থেকে
নাকি চোখে কয়লা ঢুকে যায়। Aryabas হোটেল এ থেকে আমাদের কাপড়
কেনা হতো। করিমগঞ্জ আমার জীবনের প্রথম শহর। খুব খুশি হতাম ওখানে গিয়ে। মনে হত যদি ওখানে
থাকতে পারতাম। রাতেই ফিরে আসতাম। ততক্ষণে রাত হয়ে যেত। স্টেশন থেকে বাড়ি পৌঁছেই
আবার ঘুম। ছিল না কোন চাপ, কোন দ্বায়িত্ব।
বাগানে নামঘরে
পুজো হত। মূর্তি বানানো শুরু থেকে শেষ অব্দি বসে থাকতাম। একদিন পুজোর দিন এসে যেত। উপচে পড়া খুশি আর
প্রাণখোলা আনন্দে পুজো কাটাতাম। কত বেলুন, বন্দুক, লারে লাপ্পা, আর প্লাস্টিকের খেলনা।
কত অল্পতে খুশি হতে পারতাম।
এই সুখ
দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা বাগান ছেড়ে ধর্মনগর যাই একদিন। বাগান থেকে হেটে হেটে
স্টেশন এ যেতে যেতেও ভাবিনি যে এটাই শেষ দেখা বাগানকে।
নাড়ির টানই হোক
বা ছোটবেলার স্মৃতিই হোক খুবই মধুর এই স্মৃতি রোমন্থন। (চলবে)
-তপোময় চক্রবর্তী, হায়দ্রাবাদ
Subscribe to:
Posts (Atom)