অনেকদিন থেকে ভাবছি গন্ধ নিয়ে কিছু একটা লেখি...
আমাদের ঘ্রানেন্দ্রিয় আর স্মৃতির একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। আমি বন্যার জলের গন্ধ, কুয়াশার গন্ধ, কাপড়ের গন্ধ, বৃষ্টির গন্ধকে আলাদা আলাদা করে চিনতে পারি। হায়দ্রাবাদ আর চেন্নাই এর চা এর গন্ধ ও আলাদা। কেউ বিশ্বাস করবে?? বয়স বাড়ার সাথে গন্ধের কোন সম্পর্ক আছে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু গুগল করব, ইচ্ছে আছে।
আমরা বুড়ো-বুড়ি প্রায়ই হায়দ্রাবাদের আনাচে কানাচে বেড়াতে যাই। অনেক সময় শহর ছেড়ে কিছুটা মেঠো পথ ধরে চলতে থাকি। বুনো ঘাস আর মাঠের জলকাদার গন্ধ নিজের অজান্তেই মনটাকে দূরে উত্তর পূর্ব ভারতের এক নাম না জানা চা বাগানে নিয়ে যায়। কত স্মৃতি কত গল্প। মুখ না খুলেও কত গল্প করা যায় ওই সময় এই বুড়ো বুড়ি কে দেখলেই বোঝা যাবে। কিন্তু বেচারা গৌর কি বুঝে এই মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ কি জিনিষ? অগত্যা মন না চাইলেও ফিরে আসতে হয় কংক্রিটের শহরে।
এই তো কয়েকদিন আগেকার কথা। হঠাৎ ঘরে ঢুকে মনে হলো মায়ের গন্ধ পাচ্ছি। পরে বুঝলাম যে গিন্নী পন্ডস পাউডার মেখেছেন। আমার মাও ব্যবহার করতেন। মায়ের আবার গন্ধ হয় না কি? আলবাৎ হয়। একশো বার হয়। ছোটবেলা আমি ভীষণরকম মা নেওটা ছিলাম। মায়ের সাথেই ঘুমাতাম। সারাদিনের কাজ শেষ করে যখন মা আসতেন আমি ঘুমের ঘোরেই বুঝতে পারতাম যে মা বিছানায় এসেছেন। এই ছোট ছোট গন্ধগুলো এভাবে তাড়া করে বেড়াবে আগে বুঝতে পারিনি।
আমাদের নাক আর স্মৃতির এরকম অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের আর একটা উদাহরণ। অফিস ফেরার পথে হঠাৎ মনে হলো কে যেন দুর্গাপুজোর গন্ধ নাকে ঢেলে দিল। বাইকটা বাধ্য হয়েই দাঁড় করলাম। পাশেই দেখলাম একটা শিউলি ফুলের গাছ। ব্যস, মন ব্যাটা চলে গেল বছর তিরিশ আগে। সপ্তমীর সকাল ছিল। মা ঘুম থেকে উঠিয়েই বললেন, "তাড়াতাড়ি স্নান করে নে, আমি শাঝিতে শিউলি আর স্থলপদ্ম তুলে রেখেছি, পদ্মপুর ক্লাবে দিয়ে আয়"। কি অনাবিল আনন্দই না ছিল। পেছনের গাড়িটা হর্ন না বাজালে বোধহয় টাইম ট্র্যাভেল চলতেই থাকত।
রক্তেরও গন্ধ আছে, ভীষণ গা গুলোয়। আমাদের বাগানের এক চা শ্রমিকের একবার পা কেটে গিয়েছিল। আমার মনে আছে পুরো রাত বমি করেছিলাম। মানুষ পোড়ানোর গন্ধেরও তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। হাত পটু হলে আর আত্মবিশ্বাস আসলে সেই ব্যাপারেও লেখব।
গন্ধ অত্যাচারের আরেকটা ছোট্ট গল্প শেয়ার করতে চাই। কোন একটা মন্দিরে বসেছিলাম (নাম মনে করতে পারছি না)। আচমকা মনটা ভয়ভীত হয়ে উঠল। ব্যস, মনের ব্যাক এন্ডের কাজ শুরু। একটা দুঃখজনক ঘটনায় গিয়ে সার্চ সমাপ্ত হল...আমাদের পেছনের বাড়িটা গোস্বামী কাকুর ছিল। উনার ছেলে কিশোর (ডাকনাম বাবু) আমার বন্ধু। কিশোরের এক নিঃসন্তান পিসেমশাই প্রায়ই আসতেন ওদের বাড়ীতে। সেইদিনও পিসি ও পিসেমশাই র সাথে দেখা হয়েছিল। খুব সম্ভব আমি তখন ক্লাস সেভেন এ পড়ি। হঠাৎ করেই পিসেমশাই অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন পুরো রাত মৃতদেহের পাশে থ্রি ইন ওয়ান ধুপকাঠি জ্বেলে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকে ওই ব্র্যান্ডটাই ব্যান্ড হয়ে গেল আমাদের বাড়িতে। আচ্ছা, এই টাইম ট্র্যাভেল কিন্তু খুব কম সময়ের হয়। কিন্তু বেশ লাগে। অনেকটা টক ঝাল মিষ্টি আচারের মতো।
ভোজনবিলাসি হলে কিন্তু এই গন্ধাস্ত্রের হাত থেকে মুক্তি নেই। এই যেমন, প্রেশার কুকারে বাঁশ করুল সেদ্ধ হচ্ছে, কিংবা একটু ভাপে ইলিশ বা হোক না একটু পিঠে পুলি। মন কিন্তু মা, কাকিমা, জ্যাঠিমার কাছে পৌঁছে যাবেই।
পারফিউম বা সুগন্ধির গল্প না করলে কিন্তু এই ঘ্রান ভ্রমন সমাপ্ত করা যায় না। সদ্য কৈশোর বা যৌবনে কে না ব্যবহার করেছে এই বস্তুটা। আমার বাবু খুব সৌখিন ছিলেন এই বিষয়ে। বাবু আসাম থেকে ছুটিতে আসলেই আমার ডিউটি ছিল উনার সুটকেস খোলা। সুটকেস খুললেই এক দমকা হওয়ার মতো এক নাক বাবু বাবু গন্ধ। এখনও ভাবি একটা লোক কিভাবে এত পরিপাটি থাকতে পারতেন? প্রতিটা কাপড়ে সুগন্ধ। মনেট ব্যবহার করতেন। আজও সেই গন্ধ নাকে গেলে মনে হয় বাবু পাশেই আছেন। কিন্তু আমি ব্যবহার করি না। খুব ভয় হয়...
তখন ডিয়োডরেন্ট ছিল না, ছিল মনেট, পার্ক এভিনিউ, রজনীগন্ধা (যেটা বরযাত্রী যাবার সময় বেশি ব্যবহৃত হত)। বিয়ে বাড়িতে বা কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে এর যথেচ্ছ ব্যবহার হত। কোনটা উগ্র কোনটা বা ব্যবহারকারিনির মতোই মিষ্টি। মনে দাগ কেটে যেত। আজও রজনীগন্ধার গন্ধ নাকে পৌছালে মনটা চঞ্চল হয় বৈকি। আমার শাশুড়ি মাকে আজও দেখি গৌরের বালিশ জড়িয়ে ঘুমোতে। আসলে গন্ধ আমাদেরকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছে।
Sunday, 16 September 2018
গন্ধ
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment